(5)

ব্যবসা খুব ভাল চলছে। একা পারি না। একজন কর্মচারী নিয়োগ দিলাম। তারপর আরও একজন। আমি মাঝে মাঝে এদিক সেদিন ঘুরে বেড়াই। সেই সব জায়গায় যাই যেসব জায়গায় লাশের স্ত ূপ তৈরি করেছিলাম। সেসব বাড়ীর সামনে যাই যার প্রতিটি মানুষকে খতম করেছি। শিশুসহ। অনেকগুলো বাড়ীর কথা আমার মনে আছে। দেখলাম কিছু কিছু বাড়ী এখনও খালি পড়ে আছে। তখন মাথায় বুদ্ধি এল এসব বাড়ী তো দখল করা যায়! এমনি বিহারীর অনেক বাড়ীও খালি পড়ে আছে। খুঁজে খুঁজে বের করলাম কয়েকটা। তারপর তহশিল অফিসে গিয়ে একজনের সাথে রফা হল। জাল দলীল করে আমার নামে রেজিস্ট্রি করলাম তিনটা বাড়ী। ঢাকা শহরে এখন আমি ছয়টা বাড়ীর মালিক। ভাবতেই গর্বে বুকটা ফুলে উঠে!
আমার এখন সুটকেস ভরা টাকা আর সোনার গহনা, ছয়টা বাড়ী। পাঁচটা ভাড়া পাই। ব্যবসা খুব ভাল চলছে। এখন আমি সরকারি অফিসে স্টেশনারী সরবরাহ করি। কন্ট্রাক্টর। প্রতি মাসে দু’একবার গ্রামের বাড়ী যাই। গরীব দুঃখীকে সাহায্য করি। আমার এখন অনেক সুনাম।
ঢাকা সাভারে দশ বিঘা পতিত জমি খুব কম দামে কিনে নিলাম। মিটফোর্ডে একটা ওষুধের দোকান নিলাম। আরও তিনজন কর্মচারী নিয়োগ দিলাম। আমার এখন কোন কাজ করতে হয় না। শুধু তদারকি করা। পাঁচ ওয়াক্ত আমি মসজিদে নামায আদায় করি। মাদরাসায় পড়ার গুণে আমি বেশ বয়ান করতে পারি। বয়ান করার জন্য আশেপাশের মসজিদেও আমার দাওয়াত পড়ে। আমি এখন একজন আলিম মানুষ। সবাই শ্রদ্ধা করে। কিন্তু রাতের বেলায় আমি কি করি তা কেউ জানে না।
আমি এখন একজন ধনী মানুষ। হজ্জ আমার উপর ফরয। তাই হজ্জ করে এলাম। মানুষ এখন আমাকে জানে মৌলানা হাজী ইসমাইল। কেউ কেউ হুযূর বলেও m‡¤^vab করে। যেখানেই যাই আমার একটা আলাদা মর্যাদা থাকে।
আমার স্ত্রী ছেলেমেয়েরা গ্রামের বাড়িতেই থাকে। ছেলে মেয়েরা গ্রামের স্কুলে যায়। সবাই জানে শহরে আমি ব্যবসা আর ওয়াজ মাহফিল নিয়ে ব্যস্ত । আমার লেবাস এখন আধা সৌদি। ধর্মীয় সব অনুষ্ঠানে আমার দাওয়াত পড়ে।
আমার চার ছেলে তিন মেয়ে। কেউ লেখাপড়ায় ভাল করেনি। তিন ছেলেকে ঢাকায় এনে ব্যবসায় নিয়োজিত করলাম। কিন্তু কাসেম ব্যবসা করতে নারাজ। সে বিদেশ যাবে। তাই অনেক টাকা খরচ করে তাকে কানাডা পাঠিয়েছি। সে এখন কানাডার নাগরিক।
সব ছেলেমেয়েদের বিয়ে দিয়েছি। আমার টাকা-পয়সার অভাব নেই। আল্লাহর কাজে(!) নিজকে নিয়োজিত রাখি। কিন্তু রাতে আমার কিশোরী চাই। এখন আর আগের মত প্রতি রাতে চাই না। মাসে দু’চার রাত।
কাসেম আমাদেরকে এদেশে আনার জন্য খুব করে ধরল। বলল, ভাল না লাগলে চলে যাবে যে কোন সময়। এদেশটা দেখারও সখ ছিল। এক সময় রাজি হলাম। সে তার মা এবং আমাকে স্পন্সর করেছে। আমরা তার বাসায় থাকি।
এখানে আসার কিছুদিন পরই আমার মাথায় কিশোরীর চিন্তা ঢুকল। এখানে এসব কোথায় পাব! আমার অন্য কোন কাজ না থাকায় বাচ্চাদের আরবী শিক্ষা দেই। কিশোরী দেখলে মাথা ঠিক থাকে না। অনেক সময় সুযোগ বুঝে অনেকের গায়ে হাত দিয়েছি।
এসময় উকিল তার অন্য মক্কেলের সাথে কাজ শেষ করে ফিরে এল। এসেই জিজ্ঞেস করল, ডিড ইউ ফিনিস? পড়া শেষ করেছ?
আমি বললাম, অলমোস্ট ফিনিস। প্রায় শেষ করে ফেলেছি।
তারপর সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ক্যান আই আসক ইউ এ্যা কোশ্চেন? আমি কি তোমাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি?
বললাম, কর।
হুয়াই হি ওয়াজ নট ট্রাইড ইন বাংলাদেশ? হি ইজ এ্যা সিরিয়েল কিলার! বাংলাদেশে তার বিচার হয়নি কেন?
প্রশ্নটা শোনার সাথে সাথে আমার সমস্ত শরীরে একটা বিদ্যুৎপ্রবাহ বয়ে গেল। মাথা থেকে পা পর্যন্ত জ্বলে উঠল। নিজেই যার কোন উত্তর খুঁজে পাইনি সে প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারিনি। মাথা নিচু করে আমি নীরবে বেরিয়ে এলাম। আমার সমস্ত শরীর জ্বলছে। রাগে দুঃখে আমি আমার মাথার চুল ছিড়ছি! মাথার খুলি ভেদ করে আগুনের ফুলকির মত একটি প্রশ্ন বেরিয়ে আসছে: বাংলাদেশে এই রাজাকারের বিচার হয়নি কেন? কেন! কেন! কেন....।
(সমাপ্ত)