ফিরে দেখা ইতিহাস ঘাতক রাজাকার, আল-বাদর জামাতী-খারিজীদের দিনলিপি ২৬শে মার্চ, ১৯৭১ ঈসায়ী
২৬ মার্চ ৭১-এর সেই ভয়াল দিন। যে মুহূর্তে একটি দিনের শুভ সুচনা হয় ঠিক সেই মুহূর্তে পাকিস্তানী সেনারা ঝাঁপিয়ে পড়ে এদেশের নিরস্ত্র মানুষের উপর। এদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষদের চিরতরে নির্মূল করে দেয়ার উদ্দেশ্যে পাক বাহিনী অপারেশন সার্চলাইট পরিকল্পনা অনুসারে দেশের সব জায়গায় একযোগে আক্রমণ চালায়। বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে পাক সেনারা তাদের লক্ষ্যে আঘাত হানে। কমান্ডো গ্রুপের এক প্লাটুন সৈন্য এগিয়ে যায় শেখ মুজিবের বাড়ির দিকে। গ্রেফতার করে বঙ্গবন্ধুকে। বঙ্গবন্ধুকে আটক করে মেজর জাফর তার এই সাফল্যের খবর জানায় টিক্কা খানকে। টেলিফোনের মাধ্যমে জাফর জানায়, ‘বড় পাখিটা খাঁচার ভেতর... অন্যগুলো নীড়ে নেই ......ওভার।’ বঙ্গবন্ধুর উপর টিক্কার আক্রোশ এতো বেশি ছিলো যে একজন জেনারেল তাকে টিক্কার কাছে আনতে চাইলে গর্জে উঠে বলেন, আমি তার চেহারা দেখতে চাই না। অন্যদিকে দাউ দাউ করে জ্বলছে সারা শহর। প্রত্যেকটি আক্রমণকারী গ্রুপ তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করছে উল্লাসের সাথে। ১৮ পাঞ্জাব, ২২ বালুচ ও ৩২ পাঞ্জাবের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল আক্রমণ করে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। সেনাদের উপর নির্দেশ ছিলো কোন সুযোগ না দিয়ে ছাত্র শিক্ষকদের একেবারে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়ার। কিন্তু স্বাধীনতাপ্রিয় ছাত্ররা বাধা দান করে সেনাদের। পাক সোনাদের হিংস্রতা ফুটে উঠে বিশ্ববিদ্যালয়ে আক্রমণকারী অফিসারের রিপোর্টের জবাব থেকে। ইকবাল ও জগন্নাথ হল ধ্বংস করতে সময় লাগবে জানালে হেড কোয়ার্টার থেকে চিৎকার করে জনৈক অফিসার বলে “লক্ষ্যকে ধ্বংস করতে তোমার কতক্ষণ লাগতে পারে?” ‘চার ঘণ্টা ...। ....ননসেন্স, কি কি অস্ত্র আছে তোমার কাছে? রকেট ল্যান্সার, রিফয়েলস রাইফেল, মর্টার এবং ....। ঠিক আছে, সবগুলোই ব্যবহার কর। সময় দু’ ঘণ্টা। এভাবে সোনারা আক্রমণ চালায় প্রত্যেকটি লক্ষ্যে। ২২ বালুচ আক্রমণ চালায় ইপিআর-এর উপর। ৩২ পাঞ্জাব ও ১৮ পাঞ্জাব আক্রমণ করে যথাক্রমে রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও পুরোনো ঢাকায়। রাতের অন্ধকার থাকতেই পাক সেনারা ঢাকাকে পরিণত করে মৃত্যুপুরীতে। সূর্য উঠার আগেই কমান্ডাররা সোল্লাসে কর্তাদের কাছে তাদের সফল অভিযানের রিপোর্ট পেশ করে। জালিম টিক্কা খান স্বস্তির সাথে দিনের প্রথম বাক্যটি উচ্চারণ করে, ‘একটা মানুষও নেই।’ মানুষ দেখবে কি করে? ঢাকা শহর ছিলো তখন লাশের শহর। রাস্তা, ড্রেন, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, রাজারবাগ, পুরনো ঢাকাসহ চারদিকে ছড়ানো ছিটানো ছিলো শুধু লাশ আর লাশ। মেথর পট্টির ডোমেরা সারা দিন ট্রাক ভর্তি করে লাশের স্তূপ পরিষ্কার করেছে। পাক বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল ও জগন্নাথ হল এবং রাজারবাগের পুলিশদেরকে চিহ্নিত করেছিলো স্বাধীনতাকামীদের শক্তির প্রধান উৎস হিসেবে। আর তাই প্রথম দিনেই এদু’টো এলাকাকে সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার পরিকল্পনা নেয়। আক্রমণকারী সেনাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি বিশ্বিবিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও। অধ্যাপক মনিরুজ্জামান ড. মোক্তারসহ অনেক শিক্ষক তাদের শিকারে পরিণত হয়। পাক বাহিনী তাদের নির্মমতাকে ঢেকে রাখার জন্যে ঢাকা থেকে সব বিদেশী সাংবাদিককে বহিষ্কার করে। ঢাকা শহরের সাথে সাথে দেশের প্রতিটি বড় বড় শহরেই আক্রমণ চালায় সেনারা। কুষ্টিয়া শহরে এদিন পাক সেনারা ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। কোম্পানি কমান্ডার প্রথমেই ৫ জন শহরবাসীকে হত্যা করে তাদের উপসি'তি ঘোষণা করে। তারপর শুরু হয় বাড়িতে বাড়ি গিয়ে তল্লাশি। পাবনাসহ আরো অনেক শহরে এদিন পাক সেনারা এভাবে তাদের উপসি'তি ঘোষণা করে। (তথ্যসূত্র- উইটনেস টু সারেন্ডার, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র।)
| |