ফিরে দেখা ইতিহাস
ঘাতক রাজাকার, আল-বাদর মওদুদী জামাতী, দেওবন্দী খারিজী, ওহাবী সালাফীদের দিনলিপি
১৩ এপ্রিল, ১৯৭১ ঈসায়ী
 
মরণপণ লড়াই করছিলো যেমন স্বাধীনতাকামী জনতা, তেমনি বসে ছিল না পাক বাহিনীর দোসররা। ঢাকা শহরের পাড়া-মহল্লার সব দালালদের জড়ো করে মিছিলের আয়োজন করা হয় এদিন। দেশবাসীর মধ্যে ভীতি ছড়ানোই ছিলো এ মিছিলের উদ্দেশ্য। শান্তিকমিটি গঠনের পর এটাই ছিলো তাদের বড় কর্মসূচি। রাঘব বোয়াল থেকে শুরু করে ক্ষুদে দালালরা অংশ নেয় এ মিছিলে। ১৩ এপ্রিলের এ মিছিলের সামনের কাতারে ছিলো কুখ্যাত ঘাতক গো’ আ’যম, খাজা খয়ের উদ্দিন, পিডিবি নেতা মাহমুদ আলী, কাউন্সিল মুসলিম লীগ নেতা একিউএম শফিকুল ইসলাম, জনাব সদরুদ্দিন, এ.টি. সাদী, আবুল কাসেম, আব্দুল জব্বার খদ্দর, আজিজুল হক, কেএসপি নেতা এএসএম সোলায়মান, মেজর আফসার উদ্দিন, একে রফিকুল হোসেন, আতউল হক, অ্যাডভোকেট শফিকুর রহমান, জুলমত আলী, কবি বেনজীর আহমদ, তথাকথিত পীর মোহসেন উদ্দিন। জীপে চড়ে এসে সবুর খান এ মিছিলে যোগ দেয়।
মিছিলকারীরা টিক্কা-আইয়ূর-জিন্নাহ-পাক বাহিনীর নামে জিন্দাবাদ ধ্বনি দেয়। মিছিল শেষে খাজা খয়ের উদ্দিন মিছিলকারীদের উদ্দেশ্যে নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে শত্রু (মুক্তিযোদ্ধা) নিধনের উপদেশ দেয়। ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তান এবং পাক সেনাদের বিজয় কামনা করে মোনাজাত করে গো’ আ’যম। পূর্বদেশ সম্পাদকীয় নিবন্ধে এ মিছিলের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে বলা হয়, বর্তমান পরিসি'তিতে এ মিছিল অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে, পাকিস্তান প্রেমিকদের ঐক্যবদ্ধ হতে উৎসাহ যোগাবে। সরকারি প্রেসনোটের মাধমে প্রচার করা হয়, দিনাজপুর থেকে মুক্তিযোদ্ধা উৎখাতের খবর। পাক সেনারা এসময় বেপরোয়া আক্রমণ চালায় কুমিল্লায়। লোকজনসহ ব্যাপক ক্ষতি হয় কুমিল্লার। কিন' ১৩ এপ্রিলের দৈনিক পাকিস্তানের এক প্রতিবেদনে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয় এ খবর। প্রতিবেদক জানায়, একটা গুলির শব্দও শোনা যায়নি। কুমিল্লায় শান্তিকমিটির উদ্যোগে মিছিল হয় এদিন।
সরকারি প্রেসনোটে বলা হয়, দিনাজপুর থেকে দুষ্কৃতিকারীদের উৎখাত করা হয়েছে। বাংলাদেশের গণহত্যার সঠিক চিত্র কোনো সংবাদ মাধ্যমেই ঠিকমতো প্রচার হয়নি এ সময়। বিবিসি’সহ কিছু বিদেশী পত্র-পত্রিকা দায়সারা গোছের দায়িত্ব পালন করেছে এ ব্যাপারে। ঢাকায় আক্রমণ চালানোর শুরুতেই বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা এবং পুরানো ঢাকা এলাকাকে গুড়িয়ে দেয়া হয়। পাক বাহিনী স্বাধীনতাকামী প্রতিটি মানুষের উপরই নির্যাতন চালিয়েছে।
সরকারি-বেসরকারি অফিসের কর্মচারিরাও যোগ দেয় মুক্তিযুদ্ধে। অফিসগুলো ছিলো এ সময় ফাঁকা। স্বাধীনতার ডাকে বেরিয়ে এসেছে যারা, তাদের উপর চরম নির্দেশ জারি করা হয়। এদিন ২১ এপ্রিলের মধ্যে কাজে যোগ দেবার হুমকি দেয়া হয়- কাজে যোগ না দিলে ১২০নং সামরিক আইনে বিচার করা হবে।
দৈনিক পাকিস্তানের প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, ১নং সেক্টরের সামিরক আইন উপ-প্রশাসকের দায়িত্ব থেকে ব্রিগেডিয়ার আরবাবকে সরিয়ে ব্রিগেডিয়ার কাশিমকে নিয়োগ করা হয়েছে। পিপলস পার্টি নেতা ভুট্টো নির্বাচনে পরাজিত হয়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথে না গিয়ে ইন্ধন যোগায় গণহত্যার পরিকল্পনায়। এদিন তিনি এক সভায় বলেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ দেশে এক ভয়াবহ পরিসি'তির সৃষ্টি করেছে। বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে উল্লেখ করেন তাদের, যারা আওয়ামী লীগের (তথা এদেশের মানুষের) ন্যায় সঙ্গত অধিকার নিয়ে কথা বলছিলো। তার বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় সরকার গঠনের ষড়যন্ত্রের। পাকিস্তান জমিয়তে উলেমা ইসলামের জেনারেল সেক্রেটারি মৌলানা গোলাম গাউস হাজরভী এদিন এক সাক্ষাৎকারে বলে যে, শেখ মুজিব কোনোদিনই পাকিস্তানের জনগণের মঙ্গল চায়নি। সব সময়ই চেষ্টা করেছে পাকিস্তান ধ্বংসের। কিন' কোনো চক্রান্তই পাকিস্তানকে ধ্বংস করতে পারবে না।
(তথ্যসূত্র: ১৩, ১৪, ১৫, ১৬ এপ্রিল, দৈনিক পাকিস্তান, পূর্বদেশ, আজাদ, ১৯৭১ ঈসায়ী।)